সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় রাত নামলেই শুরু হয় নদী থেকে বালু উত্তোলনের উৎসব। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে চার-পাঁচটি কার্গো জাহাজ ও ১০-১২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে চলে বালু তোলার মহড়া। ভোরের আলো ফুটার আগেই সেগুলো নদী ছেড়ে চলে যায়।
আটুলিয়া ইউনিয়নের বদ্যিবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন অভিযোগ করেন, মাসের পর মাস ধরে খোলপেটুয়া নদীর ভাঙনপ্রবণ অংশ থেকে অবাধে বালু তোলা হচ্ছে। মাঝে মাঝে প্রশাসনের অভিযানে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও কিছুদিন পর আবারও একই কার্যক্রম শুরু হয়।
স্থানীয়দের দাবি, বালুমহালের ইজারা একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী কয়েকজন যুবনেতার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় যুব সংগঠনের নেতারা যৌথভাবে এ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ফলে ভাঙনকবলিত এলাকার সাধারণ মানুষের আপত্তি প্রশাসনিকভাবে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না।
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের গলাটেপা খেয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা রণজিৎ মণ্ডল বলেন, প্রতিবছরই নদীভাঙনে তাদের বসতভিটা হুমকির মুখে পড়ে। পূর্বপুরুষের জমি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন বাধ্য হয়ে অনেকে বাঁধের পাশে বসবাস করছেন। কিন্তু কপোতাক্ষ নদ থেকে যেভাবে নিয়মিত বালু উত্তোলন হচ্ছে, তাতে নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু কয়েকজন নন, খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী আটুলিয়া, পদ্মপুকুর, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, কাশিমাড়ীসহ আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের বহু মানুষ একই অভিযোগ তুলেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বাংলা ১৪৩২ সালে দুর্যোগপ্রবণ ও ভাঙনঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় অধিকাংশ এলাকা বালুমহালের বাইরে রাখা হয়। তবে আশাশুনির হিজলদিয়া মৌজার সীমিত একটি অংশ নির্দিষ্ট শর্তে বালুমহাল ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই সীমিত অনুমতিকে পুঁজি করে খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
অব্যাহত বালু উত্তোলনের কারণে পদ্মপুকুর, ঘোলা ত্রিমোহনী, হলদেবুনিয়া, জেলেখালী, খোশালখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের শঙ্কা বেড়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। তাদের দাবি, নির্ধারিত স্থান থেকে বালু আনতে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় অধিক লাভের আশায় অন্যত্র অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে নৌ পুলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করলেও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ দেখছেন না তারা।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ ফোন রিসিভ করেননি। এক নেতা দাবি করেন, নির্দিষ্ট অনুমোদিত এলাকা ছাড়া কোথাও বালু তোলা হচ্ছে না এবং কয়েকজন মিলে ব্যবসা করার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।
বুড়িগোয়ালিনী নৌ পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন করে বালু উত্তোলনের বিষয়টি জানা গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শ্যামনগরের ইউএনও শামছুজ্জাহান কনক জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং নৌ পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী বলেন, বর্তমানে অনুমোদিত বালুমহাল না থাকলেও কেউ কেউ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীররক্ষা বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ প্রবণতা বন্ধ না হলে উপকূলীয় বাঁধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
মন্তব্য করুন