শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কলরব’-এর প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এক হৃদয়স্পর্শী সংগ্রামের গল্প। সেই অজানা ইতিহাস এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন সংগঠনের প্রাথমিক পর্যায়ের অন্যতম কর্মী, লেখক ও মাদ্রাসাশিক্ষক মাওলানা এনামুল করীম ইমাম।
নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন আইনুদ্দিন আল আজাদ (রহ.)-এর ত্যাগ, সাহসিকতা ও অদম্য প্রচেষ্টা নিয়ে, যিনি কলরবের মূল প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত।
গজল লেখা থেকে আজাদ ভাইয়ের সাথে পরিচয়
লেখেন, “ছোটবেলা থেকেই গজল লিখতাম। এই সুবাদে মাদরাসার এক বড়ভাই একদিন পরিচয় করিয়ে দেন আইনুদ্দিন আল আজাদ ভাইয়ের সাথে। তিনি স্নেহ করতেন, উৎসাহ দিতেন। তাই পাগলের মতো ছুটে যেতাম তার কাছে।”
তখন আজাদ ভাই কাজ করতেন প্রত্যয় প্রোডাক্ট নিয়ে। তবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে তা মাত্র দুই লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন। দুঃখজনকভাবে, তার ভাই সিরাজুল ইসলাম মালামাল নিয়ে ক্রেতাদের সাথে যোগসাজশে অল্প কিছু টাকা দিয়ে পালিয়ে যান। এতে আজাদ ভাই একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
এই অবস্থায় দলীয় কার্যালয় থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নেন আজাদ ভাই। বেশিরভাগ সময় কাটাতেন সাংবাদিক এবিএম শেহাবদ্দিন শেহাব-এর অফিসে ‘প্রজন্ম প্রকাশ’-এ অথবা ডিজাইনার নাজমুল হায়দার-এর কাছে।
“এক বিকেলে প্রজন্ম প্রকাশে বসে আছি আমি, আজাদ ভাই, শেহাব ভাই ও আরিফ ভাই। হঠাৎ শেহাব ভাই বললেন, ‘আইনুদ্দিন, এখন কী করবা?’”
জবাবে আজাদ ভাই বলেন, “কন তো ভাই কী করি? করার তো কিছু দেখি না!”
তখন শেহাব ভাই প্রস্তাব দেন, একটি শিশু-কিশোর সংগঠন গঠনের। আজাদ ভাই কিছুটা অনিশ্চয়তা প্রকাশ করলে শেহাব ভাই বলেন, “মনে কর সংগঠন তোমার ঠ্যাং। এর উপর ভর করেই তুমি দাঁড়িয়ে যাও।”
নামকরণ ও কমিটি গঠন
সংগঠনের নাম নিয়ে চলতে থাকে আলোচনা। আজাদ ভাই প্রথমে ‘সৃষ্টি’ নাম প্রস্তাব করেন। তবে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। অনেক তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা শেষে আজাদ ভাই হতাশ হয়ে বলেন, “এই চিৎকার-চেঁচামেচি আর কলরবই শেষ। কামের কাম কিচ্ছু হলো না।”
সেই কথাতেই অনুপ্রাণিত হয়ে শেহাব ভাই বললেন, “এই তো নাম! কলরব। সবার কলরব।”
ওখানেই গঠন করা হয় প্রাথমিক কমিটি:
চেয়ারম্যান: এবিএম শেহাবদ্দিন শেহাব
ভাইস চেয়ারম্যান: এডভোকেট মাকসুদুল হাসান চৌধুরী আরিফ
নির্বাহী পরিচালক: আইনুদ্দিন আল আজাদ
পরিচালক (প্রচার ও গণসংযোগ): এনামুল করীম ইমাম
তরুণদের আত্মনিবেদন ও ছায়াসঙ্গী হওয়া
আজাদ ভাইয়ের চারপাশে ছায়ার মতো ঘুরতেন কিছু তরুণ— সাঈদ আহমাদ, হুমায়ুন কবির শাবিব ও বদরুজ্জামান। লেখক বলেন, “তাদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা দেখে আমি অবাক হতাম। আজাদ ভাই বলতেন, ‘ইমাম ভাই! এরাই আমার আবু বকর, উমর, উসমান ও আলি (রাদি.)’”
পরে ডেমরায় শিক্ষকতা করার সময় এনামুল করীম ইমাম দেখেন, তাঁর ছাত্র সাঈদ আহমাদ, জাফর আহমাদ রাবি ও ইয়াসিন হায়দার পর্যন্ত নিজেদের হাতখরচ দিয়ে কলরবের কাজে সহায়তা করছেন।
শেষে তিনি লেখেন, “অনেক বেশি প্রয়োজন না হলে মাদরাসার বাইরে যাই না। তবে কলরবের জন্য সবসময় দোয়া ও শুভকামনা থাকে। প্রিয় আজাদ ভাইয়ের জন্য দোয়া করি — আল্লাহ যেন তাঁর দারাজাত বুলন্দ করেন।”
কলরব আজ শুধু একটি সংগঠন নয়, বরং আত্মত্যাগ, স্নেহ, বন্ধুত্ব আর ঈমানি চেতনার এক জীবন্ত দলিল। এনামুল করীম ইমামের এই লেখা সেই ইতিহাসকে তুলে ধরেছে নতুন প্রজন্মের সামনে।
মন্তব্য করুন