
চার দিন ধরে চলা হামলা-পাল্টা হামলার পর ভারত ও পাকিস্তান অবশেষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সংঘাত থেমে গেলেও দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর সম্পর্ক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এখনও দোলাচল কাটেনি। সামরিক সংঘাতের গতি-প্রকৃতি, রাজনৈতিক ভাষ্য এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে এবারকার উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সংঘাতের সূচনা
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারতের কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারান ২৬ জন। দিল্লি দাবি করে, এই হামলার পেছনে পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গিগোষ্ঠীর হাত রয়েছে। এরই জবাবে ৭ মে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালায় ভারত। চার দিন ধরে চলা সংঘর্ষে ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং পাল্টা ‘অপারেশন বুনিয়ান-উন-মারসুস’ পরিচালনা করে ১০ মে। এরপর দ্রুত যুদ্ধাবস্থা তৈরি হতে থাকলেও ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় শেষমেশ উভয় পক্ষ অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়।
যুদ্ধ না সংঘাত?
যদিও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ব্যাপকমাত্রায় গোলাগুলি, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, তারপরও কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। বরং তারা এই কর্মকাণ্ডকে সীমিত পরিসরের সামরিক অভিযান বলেই বর্ণনা করেছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক আইনে ‘যুদ্ধ’ শব্দটির নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। তাই দেশগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক প্রয়োজনে যুদ্ধ না বলে সামরিক অভিযান চালিয়ে থাকে। এটিই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসেও একাধিকবার ঘটেছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে জানান, “যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাতভর আলোচনার পর ভারত ও পাকিস্তান তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।” তাঁর এই ঘোষণার পরপরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ১০ মে বিকেল ৫টা থেকে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। দুই দেশের মধ্যে সামরিক যোগাযোগ চ্যানেল ও হটলাইনও পুনরায় চালু করা হয়েছে।
অতীত থেকে শিক্ষা
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত নতুন কিছু নয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে ১৯৪৮, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯ সালে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ হয়েছে। প্রতিবারই তৃতীয় পক্ষের (জাতিসংঘ, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্র) মধ্যস্থতায় সংঘাত বন্ধ হয়। কিন্তু মূল বিরোধ, বিশেষত কাশ্মীর ইস্যু, আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
নতুন যুদ্ধপ্রযুক্তির প্রতিযোগিতা
এবারকার সংঘাতে নজরকাড়া দিক ছিল ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার। এই প্রথমবার ভারত ও পাকিস্তান একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করে। প্রতিরক্ষা খাতে গত বছর দুই দেশ মিলিয়ে ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে, যার একটি বড় অংশই গেছে সামরিক প্রযুক্তি ও নজরদারিমূলক ড্রোন সংগ্রহে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি হলেও ড্রোন ব্যবহারে প্রতিযোগিতা এখনই থামবে না। বরং এটি দুই দেশের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
ভবিষ্যতের পথে
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও সীমান্তে মাঝে মাঝে গোলাগুলির ঘটনা, পারস্পরিক দোষারোপ এবং কূটনৈতিক বিবৃতি বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। ফলে এই বিরতি কতটা স্থায়ী হবে এবং এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে কি না—সে প্রশ্ন এখনও জিইয়ে আছে।
এই অবস্থায় ভারতের কাশ্মীর নীতি, পাকিস্তানের নিরাপত্তা কৌশল এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকাই নির্ধারণ করবে এই সংঘাত আদতে নতুন কোনো শান্তির পথে যাবে, না কি আবারো যুদ্ধের দ্বার উন্মুক্ত হবে।
সংগ্রহ ও সংকলন
মন্তব্য করুন